বাংলাদেশে ডেঙ্গু: ২৭ বছরের এক ‘অবহেলিত’ জনস্বাস্থ্য সংকট
২০০০ সালে প্রথম বড় আকারে প্রাদুর্ভাবের পর থেকে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। বিগত ২৭ বছরে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেছে, অথচ মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। মৌসুমি রোগ ডেঙ্গু এখন সারা বছরের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও, এটি প্রথম মহামারি আকারে দেখা দেয় ২০০০ সালে। এর পেছনে ১৯৬৫ সালের ‘ঢাকা ফিভার’-এর যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) চার চিকিৎসক ডা. মো. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ, ডা. রুমানা আখতার পারভীন, ডা. ফারিহা মুস্ফিকা মালেক ও ডা. আহমেদ নওশের আলমের যৌথ লেখায় বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে রিপোর্ট করা হয়েছিল, যা ‘ঢাকা জ্বর’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এরপর ১৯৭৭-৭৮ সালে কিছু বিচ্ছিন্ন রোগী শনাক্ত হয়। ১৯৯৬-৯৭ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। ২০০০ সালে ডেঙ্গু এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার পুনরায় আবির্ভূত হয়। এর মাঝে সাড়ে পাঁচ হাজার জন হাসপাতালে ভর্তি রোগী নিয়ে রেকর্ডকৃত প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব।”
২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর দেশে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তবে ২০১০ সাল থেকে এর প্রকোপ বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালে এক লাখ রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। দেশের অন্যান্য স্থানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কম থাকলেও ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহর ছিল এর কেন্দ্রস্থল। ২০২২ সালে দেশের ৬২টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। ওই বছর ডেঙ্গুর ঋতুগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অক্টোবরে সর্বাধিক সংখ্যক রোগী শনাক্ত করা হয় এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ অব্যাহত ছিল।
শত শত কোটি টাকা খরচ করেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু?
২০২৩ সালের ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আক্রান্ত ও মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই আগের সব প্রাদুর্ভাবকে ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, যার মধ্যে এক হাজার ৭০৫ জন মারা যায়। দেশে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা (২১১,১৭১ জন) ঢাকা মহানগর থেকে আসা (১১০,০০৮) রোগীকে ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৫৩, যেটা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এবং গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুম পরিবর্তন
আইইডিসিআরের চার চিকিৎসকের যৌথ লেখায় বলা হয়েছে, ২০২২ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালেও ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম পরিবর্তিত হয়ে জুলাই/আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর/অক্টোবরে হয়েছে। এছাড়াও একটা বড় সংখ্যক রোগী নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেও পাওয়া যায়। এর পেছনে নানাবিধ কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা অন্যতম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুকে ‘অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগ’হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত ২৭ বছরে এর ধরন ও আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন সারা বছরই ডেঙ্গুর প্রজনন অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকছে। আগে এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মাত, এখন নগরায়নের ফলে সৃষ্ট ময়লা ও আবদ্ধ পানিতেও এটি বংশবিস্তার করছে।’
গত নয় বছরে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশক নিধন ও যন্ত্রপাতি কেনায় ৭০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে প্রতি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যার ফলে ২০২৩ সালেই সরকারের খরচ হয়েছে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু এত ব্যয় সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব আসেনি। প্রশিক্ষিত জনবলকে অন্যত্র বদলি করা এবং প্রতিটি মৌসুমে ‘শূন্য থেকে’ প্রস্তুতি শুরু করার ফলে এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারছে না।
কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না?
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে মূল তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
১. সনাতন ভেক্টর কন্ট্রোল: মশার হটস্পটগুলো চিহ্নিত না করে ‘গণহারে’ ফগিং করার সংস্কৃতি কার্যকর নয়।
২. গবেষণার অভাব: মশার জেনোমিক কাঠামো বা ভাইরাসের বিবর্তন নিয়ে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত ‘টাইম সিরিজ অ্যানালিসিস’ বা গবেষণা নেই।
৩. নাগরিক উদাসীনতা: সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘরের ভেতর ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করার মানসিকতা ডেঙ্গুর প্রজনন ক্ষেত্রকে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু: ২৭ বছরের এক ‘অবহেলিত’ জনস্বাস্থ্য সংকটডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা, ফাইল ছবি
চিকিৎসায় ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা
‘বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিন’-এর ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে ৯৪টি মৃত্যুর কেসের মধ্যে মাত্র ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ রোগী জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা পেয়েছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড (২৮ শতাংশ) ও অ্যান্টিবায়োটিকের (৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ) অপপ্রয়োগ মৃত্যুর হারকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া রোগীদের হাসপাতালে দেরিতে ভর্তি হওয়ার ফলে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম (৩৬ শতাংশ) ও এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোমে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহাবুল হুদা বলেন, ‘ডেঙ্গুর জন্য জাতীয় গাইডলাইন তৈরি আছে। সে অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
আমাদের করণীয়
জাতীয় গাইডলাইন ও চিকিৎসাসেবা: চিকিৎসকদের জন্য বাধ্যতামূলক গাইডলাইন অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবলকে বদলি না করে ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি স্থায়ী ‘কোর টিম’ তৈরি করতে হবে এবং প্রতিটি হাসপাতালে ‘ফিভার ক্লিনিক’ সক্রিয় রাখতে হবে।
বিজ্ঞানসম্মত মশক নিধন: গণহারে স্প্রে না করে জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে মশার হটস্পট ম্যাপ তৈরি করতে হবে। লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিকের ব্যবহার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
নাগরিক দায়িত্ববোধ: বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, প্রতিরোধই একমাত্র পথ। নাগরিকদের প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট সময় ব্যয় করে ঘরের বারান্দা, এসি, ফ্রিজের নিচে, ফুলের টব ও পরিত্যক্ত পাত্রের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। দিনেও মশারির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বহুমাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও লার্ভা ধ্বংসে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণকে লড়াইয়ে সম্পৃক্ত করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটি এখন কেবল সরকারের লড়াই নয়, বরং টোটাল ফাইট বা সর্বাত্মক যুদ্ধ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ এবং নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তন—এই তিনের সমন্বয়েই কেবল আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গুর মৃত্যু মিছিল থামানো সম্ভব।




