কিডনি ডায়ালাইসিসে কমবে চিকিৎসা ব্যয় ও সংক্রমণের ঝুঁকি
দেশের বিপুল সংখ্যক কিডনি রোগীর চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী ‘ডায়ালাইসিস ফিল্টার’ আমদানিতে সব ধরনের শুল্ককর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে কিডনি রোগীদের প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই প্রস্তাবের কথা জানান।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বিপুল সংখ্যক কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়া সচল রাখতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার একটি সংবেদনশীল ও অপরিহার্য চিকিৎসাসামগ্রী। বর্তমানে এই চিকিৎসা উপকরণটি আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ করভার থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রোগীদের কষ্ট লাঘবে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আরোপিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধার কারণে কিডনি রোগীর প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে।’
যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত, কমবে মৃত্যুহার
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর ফলে রোগীরা নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে পারবেন, যা পরোক্ষভাবে কিডনি রোগীদের মৃত্যুহার কমিয়ে আনবে।
চিকিৎসা ব্যয়ে বড় স্বস্তি, কমছে হার্টের রিং ও লেন্সের দাম
জাতীয় কিডনি ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদুল হাসান বলেন, ‘বর্তমান বাজেটে ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ফিল্টার বা ডায়ালাইজারের আমদানি কর মওকুফ একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। কিডনি রোগীদের চিকিৎসার শেষ ধাপে রোগীকে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। এক সেশন রক্তের ডায়ালাইসিস করতে বর্তমানে প্রায় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি সপ্তাহে চার ঘণ্টা করে ডায়ালাইসিস করতে হলে একজন রোগীকে ডায়লাইজারের দামসহ প্রায় ছয় থেকে দশ হাজার টাকার খরচের মধ্যে পড়তে হয়, যা এদেশের আপামর জনগণের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এমতাবস্থায় সরকারের এই কর মওকুফ মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব করবে।’
ডা. মীর রাশেদুল হাসান আরও যোগ করেন, এই সুবিধার পাশাপাশি যদি দেশে ডায়ালাইজার বা ফিল্টার পুনর্ব্যবহার করার আধুনিক সুবিধা বাড়ানো যায়, তবে চিকিৎসার খরচ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব।
সংক্রমণ ও অতিরিক্ত খরচের ঝুঁকি কমবে
ডায়ালাইজার মূলত একটি কৃত্রিম কিডনি হিসেবে কাজ করে। দেশের আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের ক্ষেত্রে একটি ডায়ালাইজার বারবার ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে কিডনিরোগ বিশেষজ্ঞ ও হিউম্যান এইড অ্যান্ড রিসার্চ ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা. শেখ মোহাম্মদ মইনুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একটি ডায়ালাইজার অনেক বার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ডায়ালাইজার বারবার ব্যবহারের ফলে রোগীদের হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্তের হার অনেক বেড়ে যায়। পরবর্তীতে হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত রোগীর ভাইরাল লোড কমানোর জন্য ক্ষেত্রবিশেষে রোগী প্রতি ৭৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হয়। তাছাড়া ডায়ালাইজার বারবার ব্যবহারের ফলে রোগীর রক্তের হিমোগ্লোবিন, অনুচক্রিকা (প্লেটলেট) এবং অ্যালবুমিন কমে যেতে পারে।’
ডা. মইনুল আরও জানান, সরকার ডায়ালাইজার আমদানিতে যে ছাড় দিয়েছে, তার ফলে রোগীরা প্রতিবার নতুন ডায়ালাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ১৫০-২০০ টাকা ছাড় পাবেন। আর ডায়ালাইজার পুনঃব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ডায়ালাইসিসে সার্বিক খরচ ৬৫০-৭৫০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে।
কমবে ডায়াবেটিস-ক্যানসারের ওষুধের দাম, স্বস্তি মিলবে কিডনি রোগীদের
বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান ও উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকরা কিডনি রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করেন; কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে শরীরে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এই জটিলতায় প্রাণ হারাচ্ছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—কিডনির প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্ষমতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত রোগীরা টেরই পান না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত।
মানবদেহে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য কিডনির ভূমিকা অপরিসীম। কিডনির প্রধান কাজগুলো হলো: রক্ত থেকে ইউরিয়া, অতিরিক্ত লবণ, পটাশিয়াম এবং ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া, শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা, লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করা এবং হাড় মজবুত রাখা।
ওষুধশিল্পে মেগা ছাড়, ক্যানসারের ওষুধসহ ৭৭ কাঁচামাল আমদানিতে কর শূন্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি বিকল রোগীদের জন্য প্রথম ও প্রধান চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন এবং দ্বিতীয় বিকল্প হলো ডায়ালাইসিস। বাজেট পাসের পর ডায়ালাইসিস সামগ্রীর দাম কমলে দেশের লাখো সাধারণ ও মধ্যবিত্ত কিডনি রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং তাদের জীবনকাল দীর্ঘায়িত হবে।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সরকার বাজেটে যেসব ছাড় দিয়েছে, সেগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। এর ফলে রোগীরা কিছু সুবিধা পাবেন। কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ করা, শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়। দেশে যেভাবে ক্যানসার ও কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তা কেবল হাসপাতাল বা ডায়ালাইসিস সেন্টার বাড়িয়ে সামাল দেওয়া যাবে না। মানুষ যাতে অসুস্থ কম হয়, সেই জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সচেতনতায় বাজেটে কতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হলো— সেটাই বড় প্রশ্ন।
তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবার সংকট তুলে ধরে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, একটি ডায়ালাইসিস ফিল্টারে হয়তো ৮০০ টাকা কমবে, কিন্তু রোগীকে যদি সেই ডায়ালাইসিস করতে গ্রাম থেকে দূর-দূরান্তের শহরে আসতে হয়, তবে তার যাতায়াত ভাড়ায় চলে যাবে কয়েক হাজার টাকা। এর ওপর রয়েছে হাসপাতালের দালাল, সিরিয়াল পাওয়ার জন্য ঘুসের ভোগান্তি এবং বাইরে থেকে ওষুধ কেনার বাড়তি খরচ। ফলে এই কর ছাড়ের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাবে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।




